বাঁকানো পাহাড়ি রাস্তা, ঝুমচাষের ঢাল, ছোট ছোট বম গ্রাম, আর তার ঠিক পাশেই ব্যাংকের লোহার সেফ ভেঙে বেরিয়ে আসা নোটের গন্ধ। ২ এবং ৩ এপ্রিল ২০২৪, বান্দরবানের রুমা আর থানচি উপজেলায় দুটি সরকারি ব্যাংকে সশস্ত্র হামলা হলো অভিযোগ উঠল, কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ নামের পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী ব্যাংক লুট করেছে, অস্ত্র কেড়ে নিয়েছে, এক ম্যানেজারকে জিম্মি করেছে। কয়েকদিনের মাথায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশের যৌথ অভিযান নামে পুরো এলাকায় কেএনএফের সদস্য সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও দ্রুত স্পষ্ট হয়ে যায়, এই অভিযানের আসল লক্ষ্য শুধু গোষ্ঠীটি নয়, পুরো বম সম্প্রদায়কে শাস্তি দেওয়া।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের জরুরি আপিল দেখায়, ৭ এপ্রিল থেকে একমাসের মধ্যে অন্তত ১০০ জনের বেশি বম আদিবাসীকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে ছিল গর্ভবতী নারী, কিশোরী, এমনকি শিশু, যাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক ডাকাতির কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ দেখানো যায়নি। সেনাবাহিনী বিভিন্ন গ্রামে ভোরবেলা ঢুকে, লাউডস্পিকারে সবাইকে স্কুল মাঠে জড়ো হতে নির্দেশ দেয়, তারপর পুরুষ ও নারীদের আলাদা সারিতে দাঁড় করিয়ে এলোমেলোভাবে লোক বেছে নিয়ে থানায় পাঠায়, যেখানে তাদের সন্ত্রাস, রাষ্ট্রদ্রোহ, অস্ত্র মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হয়। সিসিটিভি ফুটেজে ব্যাংক লুটের আসল হামলাকারীদের মুখ দেখানো থাকলেও, সেই ফুটেজ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট অভিযুক্তদের টার্গেট করার বদলে পুরো বম সম্প্রদায়কেই অপরাধী ধরে নেওয়া হয়েছে, যেন জাতিগত পরিচয়ই অপরাধের প্রমাণ।
এই সমষ্টিগত শাস্তির মধ্যে সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হচ্ছে বম নারীরা। পাহাড়ি অঞ্চলের আদিবাসী নারীরা আগে থেকেই বহুমাত্রিক বৈষম্যের শিকার: জাতিগত পরিচয়ের জন্য এক ধরণের হেয় দৃষ্টি, খ্রিস্টান হওয়ার জন্য ধর্মীয় বৈষম্য, আর নারী হওয়ার কারণে পুরুষতান্ত্রিক নির্যাতন। এখন তার সাথে যোগ হয়েছে রাষ্ট্রের সামরিকীকরণ। সেনা ক্যাম্পগুলি গ্রামের স্কুল আর চার্চের পাশে গড়ে উঠছে, টহলদার বাহিনী প্রতিদিন ঘরে ঘরে গিয়ে পুরুষ না পেলে নারীদের জেরা করছে, মোবাইল ফোন কেড়ে নিচ্ছে, রাস্তায় চলাফেরায় বাধা দিচ্ছে। অ্যামনেস্টি আর স্থানীয় মানবাধিকার গ্রুপ বলছে, অনেক নারী আর মেয়ে নিরাপত্তার ভয়ে স্কুলে যাচ্ছে না, ফসলের জমি, ঝুমচাষ, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের জন্য জঙ্গলে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না এমনকি গ্রামের একাংশ জঙ্গল আর সীমান্তের দিকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে, যেখানে তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবার কোনো নিশ্চয়তাই নেই।
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে এই খবরগুলো পড়ে মাথায় ঘুরে শুধু একটাই প্রশ্ন আসে: বাংলাদেশের নাগরিকত্ব মানে কি কেবল সমতল বাংলাভাষী মুসলিম পুরুষের জন্য পূর্ণ, আর বাকিদের জন্য শর্তসাপেক্ষ? বম নারীর শরীর যেন তিনবার সীমান্তে দাঁড়ানো। একদিকে রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী, যারা তাকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী, কেএনএফ এর সমর্থক হিসেবে দেখে, অন্যদিকে সমতলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ, যারা তাকে exotic, “পাহাড়ি খ্রিস্টান মেয়ে” বলে অবজেক্টিফাই করে, আর ভেতরে তার নিজের কমিউনিটির পুরুষতান্ত্রিক প্রথা, যেখানে নারী প্রায়ই সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকে। এই সব মিলিয়ে সে এমন এক দমবন্ধ অবস্থায় পড়ে, যেখানে প্রতিবাদ করতে গেলেও ভাষা, প্ল্যাটফর্ম, নিরাপত্তা কোনোটাই তার হাতে থাকে না।
কেএনএফ প্রশ্নটিও তাই আলাদা করে দেখা দরকার। এরা একদিকে জাতিগত স্বায়ত্তশাসন, জমির অধিকার, সাংবিধানিক স্বীকৃতির কথা বলে, অন্যদিকে ব্যাংক লুট, অস্ত্র ছিনতাই, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার মতো কাজ করে, যার সরাসরি খেসারত দিতে হয় বম সাধারণ মানুষকে। পাহাড়ে বসে থাকা দরিদ্র বম কৃষক দোকানি শ্রমিকের কাছে কেএনএফ কোনো বিশেষ নিরাপত্তা দেয় না, বরং তাদের উপস্থিতি পুরো কমিউনিটিকে “সন্দেহভাজন” বানিয়ে দেয়। যখন রাষ্ট্র আর একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বে পুরো গ্রাম মাঝখানে বন্দি হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে সেইসব নারী ও শিশু, যাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, আর যাদের কণ্ঠ সবচেয়ে কম শোনা হয়।
বাংলাদেশ বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক পরিসরে বলে এসেছে, পাহাড়ি অঞ্চলে শান্তিচুক্তি হয়েছে, উন্নয়ন চলছে, সবার অধিকার রক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু জাতিসংঘ আর বিভিন্ন মানবাধিকার ফোরামে জমা দেওয়া সাম্প্রতিক রিপোর্টগুলো বলছে অন্য কথা: জুম্মা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দমন, ভূমি দখল, সামরিক উপস্থিতি, এবং কেএনএফ/বম বিরোধী অভিযানের নামে সমষ্টিগত শাস্তি পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে পাহাড়ি নারীর নিরাপত্তার প্রশ্ন শুধু নারী নীতি বা জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিং দিয়ে মেটানো যাবে না দরকার গভীর রাজনৈতিক সমাধান, যেখানে আদিবাসী নারীরা কেবল “ভুক্তভোগী” হিসেবে নয়, বরং সক্রিয় কণ্ঠ হিসেবে শান্তি আলোচনা, ভূমিনীতি, নিরাপত্তা কৌশলে অংশ নিতে পারে।
পাহাড়ি বম নারীরা এখন দুই ধরনের আগুনের ভেতর বাস করছে। একদিকে তারা কেএনএফ এর নামে লেবেলড “সন্ত্রাসী পরিবার”, অন্যদিকে তাদের বাড়ির সামনে দাঁড়ানো সেনা চৌকির দৃষ্টি, যা যে কোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করতে পারে। এই দ্বৈত ভয়ের মধ্যে থেকেও অনেকে চুপচাপ আন্তর্জাতিক সংস্থা আর মানবাধিকার গ্রুপের কাছে বার্তা পাঠাচ্ছেন, মিডিয়ায় গোপনে কথা বলছেন, আইনজীবীদের মাধ্যমে অভিযোগ তুলে ধরছেন। সেই সব নারীর সাহসকে স্বীকৃতি দেওয়া, তাদের দাবিকে জোরে উচ্চারণ করা আমাদের দায়।
বান্দরবানের পাহাড়ে যারা আজ বারুদের গন্ধে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, সেই বম নারীদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মর্যাদা নিয়ে কথা না বলে যদি আমরা সমতলে বসে শুধু “জাতীয় নিরাপত্তা” আর “রাষ্ট্রের একতা” র গল্প শুনতে থাকি, তাহলে এই রাষ্ট্রের নাগরিক ধারণাটাই ভেঙে পড়বে। কারণ একদল নারী যদি প্রতিদিন ভয়ে ঘুম থেকে উঠে, ঝুমজমি বা চার্চে যাওয়ার আগে সেনা টহলের গতিপথ বুঝে নেওয়ার বাধ্যবাধকতায় থাকে, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কোনো গল্পই পূর্ণ হয় না। পাহাড়ি নারীর নিরাপত্তা তাই কোনো “সাইড ইস্যু” না এটা এই রাষ্ট্রের নৈতিকতা, সংবিধান আর মানবিকতার মূল পরীক্ষা।