সুলতানা জেসমিনের রক্ত কার হাতে?

আমি বারবার ভাবি, রাষ্ট্রের হাতে আমাদের কতটা নিরাপত্তা থাকার কথা ছিল? অথচ সুলতানা জেসমিনের মৃত্যু দেখতে দেখতে, নিজের দেশ দেখে আগ্রাসী জল্লাদের চেহারাই আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ২২ মার্চ, ২০২৩, নওগাঁর এক সরকারি অফিসের কর্মচারী, একজন সাধারণ নারী, কোনো আলোচনায় আসার কথা ছিল না তাঁর। র‍্যাবের লোকেরা তাঁকে তুলে নিল। দু’দিনের মাথায় হাসপাতালে মৃত্যু। অথচ সরকারি ভাষায় ‘স্ট্রোক’। মৃতদেহে জখমের স্পষ্ট চিহ্ন, মাথায় আঘাত, কিন্তু কর্তৃপক্ষ বারবার বলল, অসুস্থতার কারণে মৃত্যু।
 
স্বাভাবিক মৃত্যুর ভাষা কি এমন? পরিবার বলল, “তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছে, অত্যাচার চালানো হয়েছে।” মানবাধিকার কমিশন বলল, “এটা গুরুতর অপরাধ, মানুষের অধিকারের চরম লঙ্ঘন।” পোস্টমর্টেমে ধরা পড়ল ব্রেন হেমোরেজ, সেটা কীভাবে হল, এ প্রশ্নের উত্তর নেই। চিকিৎসকেরা সরাসরি বলল না যে নির্যাতনেই মৃত্যু, রাষ্ট্র বরাবরই চায় এমন ‘মৃত্যুর ভাষা’ তৈরি করতে, যাতে প্রকৃত সত্য ধোঁয়াশায় ঢাকা পড়ে থাকে। পরিবার, প্রতিবেশী, সাধারণ মানুষ, সবাই চোখের সামনে দেখে গেলেন, অথচ আদালতে প্রমাণের অভাবে শাস্তি হল না। প্রশাসন বলল, “তদন্ত চলছে”, কিন্তু বারবার হয় কী, নামে তদন্ত, অগোচরে চাপা পড়ে যায় দায়।
 
সুলতানার মৃত্যু কেবল একটা ঘটনা না, এটা আমাদের নিত্য জীবনের ট্র্যাজেডি। রাষ্ট্র একসময় ছিল জনগণের নিরাপত্তার ছাতা আজ সেই ছাতার হাঁড়িতে আমাদের রক্ত চলে যায়, কেউ কিছু জানতেই পারে না। রাষ্ট্র শুধু নির্মম একটা আইনি কাগজ বানিয়ে বসে আছে, ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’, ‘প্রতিরক্ষা’, ‘উন্নয়ন’ তার ফাঁকে নকশাল পুলিশের মতো নির্যাতন অস্বীকারের গল্প। সমাজে নারী এমনিতেই হিংসা, দমন আর চুপ থাকার শিকার যখন প্রশাসনের হাতে পড়ে, তখন তো পুরুষতন্ত্রের সব মুখোশ একসঙ্গে ফাটিয়ে বেরিয়ে পড়ে, “গলায় দড়ি পাওয়ার মতো অসুস্থতা”, “প্রয়োজনীয় তদন্ত হচ্ছে”, এসব ব্যঙ্গ কথার মতো শুনতে লাগে।
 
নিজের শরীর নিয়ে, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে, একটা স্বাধীন দেশে আওয়াজ তুলতেও এখন হিসেব করা লাগে। দুর্বৃত্ত প্রশাসন চায়, সবাই শুধু ডর করুক। সুলতানার রক্ত ঝরল, কারণ তিনি দেশের ব্যবস্থায় স্বভাবিক প্রশ্ন তুলতে চেয়েছিলেন তাঁর মুখ বন্ধ করেছে রাষ্ট্র, ভবিষ্যতে আর কেউ প্রশ্ন না তোলে সেই আতঙ্ক ছড়ানোই ছিল এই নির্মমতার লক্ষ্য। কোর্টের রিপোর্ট, তদন্তের ফাইল, সংবাদপত্রের হেডলাইন, সবকিছু মিলেও একটা নিরপরাধ মৃত্যুর জন্য স্বস্তি আনতে পারেনি। রাষ্ট্র একেকটা নারীর কণ্ঠ, শরীর, জীবন, সব অসহায়ভাবে থামিয়ে দেয়। আর আমরা, বাকিরা শুধু একটার পর একটা সংবেদনশীল স্ট্যাটাস দিয়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ করি।
 
সুলতানার ঘটনায় নিজের অভিজ্ঞতা ফিরে দেখি, বাংলাদেশে নারীর জন্য নিরাপত্তা মানেই রকমভেদে ভয়। সেই সাধারণ কর্মজীবী নারী, যাঁর সামনে কোনও উচ্চপদস্থ ক্ষমতাধর আসে, জানেনা কখন নিজের কী হবে। আমি নিজে, অনেকবার অফিস বা থানায় হেনস্তা, ভয়ের ছায়া, পুলিশের হুকুম, এসবের মুখোমুখি হয়েছি। লন্ডনের রাস্তায় হাঁটলে ওই আতঙ্কের স্মৃতি আজও গলা ছাপিয়ে ওঠে, “আপনি প্রশ্ন তুললে বিপদ হতে পারে।” রাষ্ট্রের হাতে যখন কেউ মারা যায়, তখন পুরো সমাজ কেমন একটা হিম জলের মধ্যে ডুবে থাকে। কেউ চায় না সত্যি কথা জানাতে, কেউ চায় না সত্যিকারের বিচার। পরিবারের কান্না, প্রতিবেশীর শোক, সামাজিক মিডিয়ার আয়োজন, এতেই শেষ হয়ে যায় সবকিছু।
 
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দানব তৈরি করেছে। র‍্যাব, পুলিশ, সিকিউরিটি ফোর্স, তাদের হাতে বহু বছর ধরে মানুষ মরছে। বিচারহীনতার এমন অভ্যেস জাতি গড়ে তুলেছে, যেখানে মৃত্যু নিয়ে আমরা কাঁদি, কথা বলি, কিন্তু একা পড়ে যাই। সুলতানার রক্ত রাষ্ট্রের, প্রশাসনের, সমাজের সার্বজনীন সবলে ঘেরা, এই জল্লাদের মুখচিহ্ন একাধিক, কিন্তু উত্তরদায়িত্ব কারও নেই।
 
এভাবে রাষ্ট্র যখন কেবলই জল্লাদ রূপে দাঁড়িয়ে থাকে, আমাদের চুপ থাকা মানে অপরাধীর হাতে রক্তের ভেট দেয়া। প্রশ্ন করতে হবে, উচ্চারণ করতে হবে, কারণ না বলা মানে নিজেকে আরেকটা নির্যাতনের জন্য প্রস্তুত রাখা, এটাও আমাদের প্রত্যেকের মৃত্যুর পুর্বাভাস।