=== console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block. === console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block. === console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block. === console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block. === console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block. === console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block. === console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block. === console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block. === console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block. === console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block.

পাহাড়ে রক্তের দাগ, সমতলের নারীবাদীরা চুপ কেন?

চট্টগ্রাম হিলট্র্যাক্টসের খবর আমাদের সমতলের সংবাদপত্রে খুব কমই জায়গা পায়। পাহাড়ে মানুষ মারা যায়, পাহাড়ে নারী ধর্ষণের শিকার হয়, পাহাড়ে ঘরবাড়ি জ্বলে যায়, পাহাড়ের ছেলেমেয়েরা গুম হয়, এসব যেন আরেকটা ভৌগোলিক দেশের গল্প, যার সঙ্গে ঢাকার, চট্টগ্রামের, খুলনার নারীবাদী আড্ডার তেমন সম্পর্ক নেই। অথচ এই একই দেশে, আমাদেরই সংবিধানের ভেতর, আমাদেরই রাষ্ট্রের বুটের ছাপ গিয়ে পড়ে ওই পাহাড়ি মাটির গায়ে। নব্যায়ন চাকমা মিলন, একজন আদিবাসী রাজনৈতিক কর্মী, পাহাড়ি অধিকারের সংগ্রামী। ২০২২ সালের মার্চে সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল, আন্তর্জাতিক সংস্থা আর মানবাধিকার গোষ্ঠী তখনই বলেছিল, এটা কেবল একটা ‘কাস্টডিয়াল ডেথ’ নয়, এটা পাহাড়ে চলমান রাষ্ট্র সেনা বাঙালি শাসনের এক নগ্ন উদাহরণ। ২০২৩ সালে যখন মানবাধিকার রিপোর্টগুলোতে আবার মিলনের নাম ফিরে এল, তখন বোঝা গেল, পাহাড়ের রক্ত এখনও শুকায়নি, শুধু আমাদের চোখের সামনে থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে।
 
মিলনের গল্পটা আমি প্রথম পড়ি নিউইয়র্কভিত্তিক এক মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে। সেখানে লেখা ছিল, ভোররাতে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যায় সেনাসদস্যরা তিনি তখন কোনও চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠছিলেন, দুর্বল শরীর নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলেন। সাক্ষীরা বলেছে, ঘন্টার পর ঘন্টা তাকে লাথি, কিল, লাঠি দিয়ে পেটানো হয়, গায়ে-বুকের ওপর বুট চালানো হয়, হাত পা ভেঙে যাওয়ার মতো অত্যাচার চলে। প্রায় অচেতন অবস্থায় তাকে নিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর হাসপাতালে আনা হয়, যেখানে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সামরিক বাহিনী বলল, সব কিছু নাকি আইনের মধ্যেই হয়েছে, আর তদন্তের কথা বলতে বলতে সময় পেরিয়ে গেল, বিচার, জবাবদিহি, দায় স্বীকার, কিছুই হল না।
 
বিশ্বের কাছে এটাকে তারা বলল “একটি আলাদা দুর্ঘটনা”, কিন্তু চট্টগ্রাম হিলট্র্যাক্টসের মানুষের কাছে এটা আলাদা কিছুই না। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির পর থেকে পাহাড়ে সেনা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও বাস্তবে এই অঞ্চল এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সামরিকীকৃত এলাকা নতুন ক্যাম্প, নতুন ব্যাটালিয়ন, নানান বাহিনীর চেকপোস্ট আর টহল, সব মিলিয়ে পাহাড়ের জনগণ যেন প্রতিদিনই কাস্টডিতে বাস করছে। আন্তর্জাতিক রিপোর্টগুলো বারবার লিখছে, পাহাড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যা, নির্যাতন, গুম, যৌন সহিংসতা, ভূমি দখল, এসব চলছেই, অভিযোগ উঠলেও সেনাবাহিনী বা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত প্রায় হয় না বললেই চলে।
 
এই জায়গাটা থেকেই প্রশ্নটা জ্বলে ওঠে, সমতলের নারীবাদীরা চুপ কেন? আমরা যখন ঢাকায় বসে ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে লিখি, যখন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে গলা ফাটাই, তখন আমাদের কণ্ঠ খুবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই কণ্ঠ পাহাড়ে পৌঁছে না। পাহাড়ি নারীর শরীর যখন সামরিক বুটের নিচে, পাহাড়ি পুরুষ যখন গুমের ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারে না, পাহাড়ি শিশুর স্কুল পথে যায় সামরিক চেকপোস্টের সামনে দিয়ে, এই অভিজ্ঞতাগুলোকে আমারা কতটা “নারীবাদী ইস্যু” হিসেবে দেখি? আদিবাসী নারীর ও আদিবাসী পুরুষের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকে যদি আমাদের আন্দোলনের কেন্দ্রে না আনি, তবে আমাদের নারীবাদ কেবল সমতলের মানুষ, সমতলের মধ্যবিত্ত, সমতলের শহুরে শরীরকেই ঘিরে থাকবে।
 
আমি নিজে একজন সমতলের নারী, তার ওপর নাস্তিক, উভকামী। আমার নিজের জীবনে যে ভয় কাজ করে, আইন, মৌলবাদ, পরিবার, সমাজ, সেগুলো গভীর, অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু পাহাড়ি নারীর ভয় আরও জটিল: সে একসাথে রাষ্ট্র, সেনা, বাঙালি সেটলার আর নিজের সম্প্রদায়ের পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ি নারীর ওপর ধর্ষণকে বহুবার রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, ভূমি দখল, ভয় দেখানো, অধিকার দাবির প্রতি প্রতিশোধ হিসেবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহুবার নথিভুক্ত করেছে, পাহাড়ে যৌন সহিংসতার ঘটনায় অভিযুক্ত সেনা বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বিচার প্রায় নেই, অভিযোগ উল্টো স্থানীয়দের ওপরই ঘুরে দাঁড়ায়। সমতলের ফেসবুক টাইমলাইনে এই গল্পগুলো খুব কমই দেখা যায়, খুব কমই কোনো জনপ্রিয় ফেমিনিস্ট পেজ এসব নিয়ে ধারাবাহিক লিখে।
 
কখনও কখনও মনে হয়, আমরা সমতলের নারীবাদীরা একটা সুবিধাজনক নিরাপত্তা বলয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলি। রাজধানীর ক্যাফেতে বসে পাহাড়ের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করা সহজ, কিন্তু পাহাড়ি নারীর কণ্ঠকে কেন্দ্রে রেখে নিজের অবস্থান বদলানো কঠিন। পাহাড়ি নারীর ছবি প্রায়ই ব্যবহার হয় ভিন্নতা, রঙিন শাড়ি আর ঐতিহ্যবাহী সাজের পোস্টারে কিন্তু তার রক্তের দাগ, তার শোকে কাঁপা গলা, তার আতঙ্কিত চোখ, এসব আমরা প্রচারমাধ্যমের ফ্রেমে আনতে চাই না। উল্টো অনেক সময় শুনি, “পাহাড়ের সমস্যা তো খুব সেনসিটিভ, ওটা নিয়ে লিখলে ঝামেলা হবে”, মানে রাষ্ট্রের রোষের ভয়ে আমরা নিজেদের নারীবাদকে সংযমী করে ফেলি।
 
নব্যায়ন চাকমা মিলনের মৃত্যু আমাদের সামনে এক নির্মম আয়না ধরেছে। একজন আদিবাসী পুরুষকে যখন নির্যাতন করে মারা হয়, তার পরিবার, স্ত্রী, সন্তান, মা-বোন, তাদের ভাঙাচোরা জীবন নিয়ে আমাদের নারীবাদী আলোচনায় খুব কম কথা হয়। তার স্ত্রী রাতে কি ভয়ে ঘুমাতে পারেন? তার কিশোরী মেয়েটা যখন দেখে যে তার বাবাকে আইনের নামে হত্যা করা গেছে, তখন রাষ্ট্র, সেনা, বাঙালি সমাজ, সবকিছুর প্রতি তার বিশ্বাস কেমন থাকে? আমরা কি এই মানসিক ট্রমাকে নারী অধিকার, মানবাধিকার আর ন্যায়বিচারের আলোচনার মধ্যে রাখছি? নাকি পাহাড়ের মানুষদের আলাদা “সিকিউরিটি ইস্যু” হিসেবে দেখে আন্দোলনের তালিকায় ফেলে রাখছি?
 
পাহাড়ে রক্তের দাগ মানে শুধু একটি মৃত্যুর গল্প না এটা উপনিবেশিক শাসনের ধারাবাহিকতা, যেখানে সংখ্যাগুরু বাঙালি রাষ্ট্র তার সামরিক শক্তি আর প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে ছোট জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করে। নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গর্ব করার পাশাপাশি আমরা ভুলে যাই, এই একই রাষ্ট্র আবার অন্য কারও ভূমি দখল করছে, অন্য কারও সংস্কৃতি, ভাষা, পরিচয়কে তুচ্ছ করে দেখছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে বারবার বলা হয় “উন্নয়নের পথে বাঁধা সশস্ত্র গোষ্ঠী”, কিন্তু খুব কমই বলা হয়, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিতে যে সেনা প্রত্যাহার, ভূমি কমিশন, স্বায়ত্তশাসনের কথা ছিল, তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে। যখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবে আসে না, তখন পাহাড়ের অস্থিরতা আসলে রাষ্ট্রের নিজের ভঙ্গ প্রতিশ্রুতির ফসল।
 
তাহলে প্রশ্নটা আবার করি, সমতলের নারীবাদীরা চুপ কেন? হয়তো কারণ পাহাড়ের সংগ্রামকে আমরা আমাদের সংগ্রামের অংশ ভাবিনি। আমরা ভেবেছি, পাহাড়ের মানুষ নিজেদের মতো করে লড়ুক আমরা ঢাকা, সিলেট, রাজশাহীতে নিজেদের গণ্ডির মধ্যে লড়ি। এই বিভাজনের ফলেই রাষ্ট্র সব সময় সুবিধা পায়, একদিকে পাহাড়কে সামরিক শাসনে রাখে, অন্যদিকে সমতলে নিজেদের গণতান্ত্রিক, উন্নয়নমুখী, নারী অধিকার বন্ধু হিসেবে সাজিয়ে রাখে।
 
নিজের নারীবাদী পরিচয়ের দিকে তাকিয়ে তাই এখন আর শুধুই জেন্ডার দিয়ে লড়াইকে সংজ্ঞায়িত করতে ইচ্ছে হয় না। নারীর অধিকার মানে কেবল তো গায়ে হাত না পড়া না মানে নিজের মাটিতে নিরাপদ থাকা, নিজের ভাষায় কথা বলতে পারা, নিজের রাজনৈতিক মতের জন্য নির্যাতনের ভয়ে না থাকা। পাহাড়ি নারী যখন সামরিক চেকপোস্ট পেরিয়ে হাঁটে, পাহাড়ি পুরুষ যখন রাতে সেনা টহলের শব্দে আঁতকে ওঠে, তখন তাদের জন্য আমাদের ফেমিনিজম যদি কিছু বলতে না পারে, তাহলে সেই ফেমিনিজম অসম্পূর্ণ, আংশিক, সুবিধাজনক।
 
এপ্রিল ২০২৩-এ বসে পাহাড়ে মিলনের মৃত্যুর কথা ভাবতে গিয়ে মনে হয়, এই রক্তের দাগ আমাদের প্রত্যেকের হাতেও লেগে আছে, কারণ আমরা চুপ থেকেছি। আন্তর্জাতিক রিপোর্ট, এনজিওর বিবৃতি, কাগজের সাদা পাতায় কালো হরফে লেখা “কাস্টডিতে মৃত্যু”, এসবের বাইরে আমাদের ব্যক্তিগত অবস্থান কী? আমরা কি এই মৃত্যুকে আমাদের সংগ্রামের অংশ করব, নাকি “সিকিউরিটি ইস্যু” বলে পাশ কাটিয়ে যাব? পাহাড়ের রক্ত শুকোতে শুকোতে সমতলের বিবেকও ধীরে ধীরে পাথর হয়ে যাচ্ছে। এই পাথর ভাঙার কাজটা যদি আমরা না করি, তবে একদিন সেই একই বুটের শব্দ সমতলের গলিতেও নেমে আসবে, তখন আর পাহাড়-সমতল আলাদা করে দেখার সুযোগ থাকবে না।