সেলাই মেশিনে মিশে আছে কান্না, আঞ্জুয়ারা খাতুনের রক্তে রক্তাত

গাজীপুরের সেই রাস্তা আরেকবার রক্তাক্ত হল, এবার আঞ্জুয়ারা খাতুনের শরীর দিয়ে। আঞ্জুয়ারা, মাত্র ২৩ ২৮ বছর বয়সী এক সেলাই মেশিন অপারেটর, দুই সন্তানের মা। কারখানার মেঝেতে বসে সারা দিন ধরে জামা বানিয়ে দেয় সামান্য বেতনের জন্য, হাতে গুনে মাস শেষে যা পেত, তা দিয়ে আর কিছুর সাথে পারা যেত না, একের পর এক মন্দা, ডাল চাল তেলের দাম বাড়ছে, বাচ্চার স্কুল, ভাড়া, খরচের সঙ্গে স্লুইব্ল. আর সহ্য হয়নি তাই সে এবং আরও কয়েক হাজার নারী পুরুষ বের হয়েছিল মজুরি বাড়ানোর আন্দোলনে। পুলিশ গুলি ছোঁড়ে, গুলির শব্দে চিড়িয়ে যায় শত শত জীবনের ভবিষ্যৎ। আঞ্জুয়ারা গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন স্বামী জানিয়েছেন, গাড়িতে তুলতেই তিনি মারা যান।
 
পত্রিকায় লেখা হল, “শ্রমিক পুলিশ সংঘর্ষে প্রাণহানি”, কিন্তু এই প্রাণটা ছিল কার? একটা মেয়ের জীবন, সেলাই মেশিনের কারিগর, বিশ্ববাজারের দশ হাজার, লাখো টি শার্টের পেছনে যার ঘাম লেগে ছিল, এমনই সাধারণ গরিব, যাকে কেউ চেনে না, পড়ে গেলে বাঁচানোর চেষ্টা করে না। বাংলাদেশ আজকের দিনে সাড়ে তিন হাজার পোশাক কারখানা, চার কোটি ডলারের রপ্তানি বাজার, হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক, শত শত বিদেশি ব্র্যান্ডের “এথিক্যাল” আর “ফিমেইল এমপাওয়ারমেন্ট” গল্পের আড়ালে আঞ্জুয়ারাদের লাশই পড়ে থাকে সবচেয়ে বেশি। ফ্যাস্ট ফ্যাশন মানেই হল রক্তের ওপর দামী বাটিক ঠেকিয়ে গল্প বলা।
 
এ বছর ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিকরা যখন রাস্তায় নামে, সরকার আর মালিকদের মজুরি বোর্ড মিলে ৮ হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ১২,৫০০ টাকা স্থির করে, শ্রমিকদের দাবি ছিল অন্তত ২৩ হাজার। কিন্তু বাস্তবে এই অঙ্ক, বাজারমূল্য, মূল্যস্ফীতি, ডলারের দামের সাথে তাল মেলাতে পারে না, তবু সরকার বাহাদুর বললেন, “বেশি চাওয়া যাবে না, উৎপাদনের ক্ষতি হবে।” যখন শ্রমিকেরা প্রতিবাদ করল, তখন মালিকপক্ষ কারখানা বন্ধ করল, পুলিশ এলো রাস্তায়, ফ্যাক্টরি এলাকা অশান্ত হল, আল্টিমেটলি দুই তিনজন শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেল, অনেকেই আরো আহত, আটক। আঞ্জুয়ারা তাদেরই একজন, সেলাই মেশিনে ঠোকাঠুকির বদলে তাঁর যন্ত্রে এবার রক্ত জমে রইল।
 
এই খুনটা নিয়ে বিশ্ববাজার বিষম কেবল দুশ্চিন্তায় পড়ে, যদি পণ্য রপ্তানিতে দেরি হয়, শ্রমিকদের ক্ষোভ বাড়ে, ছবি আর প্রতিবেদনে “গার্মেন্টস শিল্প ঝুঁকিপূর্ণ” লিখতে হয়। অথচ ওদিকে ফ্যাশন ব্র্যান্ড, এইচঅ্যান্ডএম, জারা, লেভিস, তাদের লেবেল, ওয়েবসাইটে নারীর ক্ষমতায়নের গল্প ছাপাতে ছাড়ে না। কিন্তু মাঠের আঞ্জুয়ারা যেন কেবল পরিসংখ্যান, তার মৃত্যুর কোনো বৈশ্বিক মূলধারা নেই “একজন নারী শ্রমিক গুলিতে মারা গেছে”, এটা গল্পের শেষ নয়, বরং কেবল নতুন একটি গার্মেন্টস, একটি ব্যবসায়িক মহৎ উদ্দ্যেশ্যের চলমান শোকগাঁথা।
 
এভাবে বারবার প্রমাণ মেলে, এই উন্নয়নের গর্ব যখন সরকারি ভাষায় আসে, তখন শ্রমিক নারীর জীবনের মূল্য একদম তলানিতে। তাদের শ্রমের অর্থ, তাদের ঘাম, রাত জাগা শরীর, সন্তানের অনিশ্চয়তা আর ঘাম, এসবের ওপরই দাঁড়ানো বাংলাদেশের অরিজিনাল “সংস্কার”। পোশাক কারখানায় সেলাই মেশিনটা তাই কেবল একটা যন্ত্র না, ওটা আসলে রক্তে ভেজা এক পড়শি স্মৃতির ভাগ, আজ আঞ্জুয়ারা, কাল অন্য কেউ, পরশু হয়তো নিজের আত্মজন।
 
আমি যদি শহুরে অথবা প্রবাসী নারী হিসেবে নিজের পক্ষবোধের দিকে তাকাই, দেখি এই রাষ্ট্র, এই পিতৃতন্ত্র নারী ‘ক্ষমতায়ন’ এর নামেও যে তার জীবনের তলানিতে গুলি চালাতে দ্বিধা করে না। কর্মক্ষেত্র, সংসার, রাজপথ, সবখানে নারী সবচেয়ে অরক্ষিত। শ্রমের মজুরি, নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক দাবি, নুন্যতম জীবনযাপনের প্রাপ্যতা, এসব দাবিতে দাঁড়ালে তার মৃত্যু খবরও একদম নিচের লাইনে, ছবির শিরোনামে স্থান পায়।
 
দুনিয়া যতই “সাসটেইনেবল ফ্যাশন”, “এথিক্যাল সোর্সিং”, “জেন্ডার ইক্যুইটি”র গল্প বলে, বাংলাদেশের আঞ্জুয়ারাদের রক্ত সেইসব প্রচারণার কালি। আঞ্জুয়ারার কান্না, তাঁর দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ, তাঁর ক্ষুধারাত পেট, গলা ভাঙা স্লোগান, এসব বুকের মধ্যে চেপে আসে। আমাদের দায় এই গল্পগুলোকে মধ্যবিত্ত নিপীড়ন বা “শ্রমিক সমস্যা” নামে পাশ কাটিয়ে না যাওয়া বরং এই প্রতিবাদের রাজনীতিটাকে মানবাধিকারের ভরকেন্দ্রে নিয়ে আসা। কারণ আঞ্জুয়ারার খুন, কাজের জায়গায় গুলি, আজকের বাংলাদেশে রাষ্ট্র পুঁজিবাদ বিপুল বৈদেশিক মুনাফা এই জোটবদ্ধ সহিংসতার প্রতীক।
 
তা না হলে, উন্নয়নের গ্ল্যামার আর ফ্যাশন আশায় আমাদের ডেস্কে, দোকানে, সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে গড়িয়ে বেড়াবে শুধু আরেকটা আঞ্জুয়ারা, আরেকটা কান্না, যার শব্দ আর রক্ত থেমে যাবে সেলাই মেশিনের নিস্তব্ধতায়।