২০২৪ সালের জানুয়ারি শুরু হয়েছিল নির্বাচনী উত্তাপ আর রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেই কিন্তু সাধারণ বাংলাদেশি মেয়েদের জন্য ভোরের দৃশ্যটা খুব একটা বদলায়নি। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রথম কাজ স্বামী সন্তানের নাস্তা সংসারের হাড্ডাহাড্ডি ভাঙা হিসাব এরপর হয়তো অফিস বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি কিন্তু এই সমস্ত ভূমিকার মাঝখানে কোথাও তার নিজের ইচ্ছা বা নিরাপত্তা যেন আলাদা করে জায়গা পায় না। জাতিসংঘ আর ব্রিটিশ সরকারের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে গত দুই দশকে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ঠিকই কিন্তু সংসার ও সমাজে পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রায় একই রকম রয়ে গেছে সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে “নারী ও পুরুষের সমান অধিকার”র প্রতিশ্রুতি থাকলেও প্রায় সব স্তরের সামাজিক মানসিকতা এখনো পুরুষকেই সম্পদ সিদ্ধান্ত ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের স্বাভাবিক মালিক ধরে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ শুধু তিন মাসেই অন্তত ১১৪ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৩৭ নারী গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হয়ে খবরের কাগজে এসেছেন এর মধ্যে ৬৫ জনকে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ি হত্যা করেছে আর ৪৯ জন লজ্জা অপমান আর নিরাশায় আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। এটা কেবল সংবাদপত্র নির্ভর পরিসংখ্যান ইউনএফপিএর সর্বশেষ সার্ভে বলছে অন্তত ৭৬ শতাংশ বিবাহিত নারী জীবনের কোনো এক পর্যায়ে স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর হাতে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন অর্থাৎ এই দেশে বিয়ে নামের প্রতিষ্ঠাটি বহু নারীর জন্য এখনো ভালোবাসার আশ্রয়ের চেয়ে বেশি এক ধরনের বৈধ কারাগার। একই সময়ে কিশোরীদের অর্ধেকের বেশি এখনো ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হচ্ছে ফলে শিক্ষার সুযোগ হারিয়ে তারা আরও বেশি স্বামীর আর্থিক ও ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণের ভেতর ঢুকে পড়ছে।
একজন উভকামী নাস্তিক নারীবাদী নারী হিসেবে নতুন বছরের সকালকে তাই দেখি পুরোনো শেকলেরই নতুন সংস্করণ হিসেবে যেখানে কিছু মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে গিয়ে নারীবাদ পড়ে আবার বাসায় ফিরে এসে দেখতে পায় রান্না না করায় বা হিজাব না পরায় তাকে অপমান করা হচ্ছে “ভালো মেয়ে”র মাপকাঠিতে না মেলায়। যে শরিয়তি ব্যাখ্যাগুলো টেলিভিশন টকশো থেকে মসজিদের মাইক আর ইউটিউব ওয়াজে প্রতিদিন ভেসে আসে সেগুলো নারীর দেহকে একদিকে ইজ্জতের পাত্র আর অন্যদিকে পুরুষের ফিতনা বন্দুক বানিয়ে রাখে বাড়ির ভেতরে আবার রাস্তায়ও। আমার মতো কেউ যখন বিয়ে না করেও বাঁচতে চায় বা নারীর শরীর ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার কথা বলে তখন সমাজের একাংশ দ্রুতই ধর্ম আর সংস্কৃতির নামে নিয়ন্ত্রণের তলোয়ার বের করে ফেলে যেন নারীর উপর থেকে সেই পুরোনো শেকল ঢিলা হলেই পুরো পরিবার রাষ্ট্র আর ধর্ম ভেঙে পড়বে।