ধর্ষণ আর গৃহহিংসার খবরে দেশ যখন প্রায় অসাড়, তখন একদল মেয়ে ঠিক করল যে তারা আর কাঁদতে নয়, রাগ নিয়ে রাস্তায় নামবে। মে ২০২৪ থেকে সারা বছরজুড়ে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, প্রেসক্লাব, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে নারী কিশোরীরা ব্যানার হাতে নেমে এলো, স্লোগান ছিল খুব পরিষ্কার: “বিচার চাই, করুণা নয়”, “বোনের সম্মান রাখো, নয়তো গদি ছাড়ো”, “ধর্ষকের ফাঁসি নয়, বিচার চাই, প্রতিরোধ চাই।” টানা কয়েক মাসে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি মাসে গড়ে শতাধিক নারী শিশু ধর্ষণ, গ্যাং রেপ, স্বামীর হাতে হত্যা, যৌতুক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২০২৪ সালে ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা প্রায় তিন হাজার ছুঁয়েছে, আর গৃহহিংসার মামলা আরও কয়েক হাজার। এই সংখ্যার পেছনে যে রক্ত, কান্না, ভাঙা হাড়, অপমানের ইতিহাস, তা বুঝে নিয়েই মেয়েরা এবার স্লোগানের ভাষা বদলে দিল।
এই নতুন ঢেউয়ের শক্তিটা ছিল, তারা একেবারে সিস্টেমের গোঁড়ায় গিয়ে আঘাত করেছে। “উই আর নট গইং টু বি সাইলেন্সড” ব্যানার নিয়ে যারা বেরিয়েছিল, তারা কেবল ধর্ষকের জন্য কড়া শাস্তি না, বরং পুলিশ, আদালত, মেডিকেল, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্রের ব্যর্থতার কথা বলেছে। মেয়েরা বলেছে, ধর্ষণের পর থানায় যেতে গেলে পুলিশ প্রথমে প্রশ্ন করে “কেন গিয়েছিলে”, “কী পোশাক ছিল”, “আগে সম্পর্ক ছিল কি না” মেডিকেল টেস্টের নামে ভিকটিমকে আবার বারবার নগ্ন হতে বাধ্য করা হয় মামলার কোর্টে গিয়ে তাকে এমনভাবে জেরা করা হয় যেন সে নিজেই অভিযুক্ত। তাই তাদের দাবি ছিল, শুধু আইনে ফাঁসি যোগ করলেই হবে না, বাস্তবে দ্রুত বিচার, ভিকটিম স্পর্শকাতর তদন্ত, সাপোর্ট সার্ভিস, এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত চাই। কেউ কেউ ব্যানারে লিখল, “আমাদের দুঃখ লাগবে না, আমাদের রাগ লাগবে।” এই রাগটাই ছিল নতুন।
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে এই মার্চগুলোতে দেখা মেয়েদের মুখ, স্লোগানের ভাষা, পোস্টারের শব্দ আমার নিজের কিশোরীবেলার স্বপ্ন আর ভয়ের সাথে মিশে যায়। আমি বড় হয়েছি এমন এক সমাজে, যেখানে ধর্ষণ সংক্রান্ত খবর এলে প্রথমেই কানের সামনে দরজা বন্ধ হয়ে যেত, কেউ বলত “এগুলো নিয়ে বেশি ভাবিস না”, কেউ বলত “মেয়েরা এখন অনেক বেপরোয়া হয়ে গেছে।” এখন দেখি, নতুন প্রজন্মের মেয়েরা কী সহজে বলে ফেলছে, “আমরা মেয়ে বলে মার খাব, ধর্ষিত হব, আবার চুপও থাকব, এ নিয়ম আর মানছি না।” এই সাহস আমাকে আশাবাদী করে, আবার একই সাথে ভয়ও দেখায়, কারণ এই রাষ্ট্র আর সমাজ যতটা না ধর্ষককে, তার চেয়েও কখনো কখনো বেশি শাস্তি দিতে চায় প্রতিবাদী নারীকে।
তাই যখন দেখি, নারী নেতৃত্বাধীন এসব মিছিলের উপরেই কখনো পুলিশ ব্যাটন তোলে, কখনো টিয়ার গ্যাস ছোড়ে, কখনো সামাজিক মাধ্যমে ট্রল আর্মি নেমে এসে তাদের “বেহায়া”, “নাস্তিক”, “এনজিও ফান্ডেড” বলে গালি দেয়, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না, লড়াইটা কেবল আইন না বদলানোর, বরং ক্ষমতার কাঠামো বদলানোর। একটা মেয়ে যখন “বিচার চাই, করুণা নয়” বলে, আসলে সে বলছে, “তুমি আমাকে বোন, মা, মেয়ে ট্যাগ দিয়ে ব্যবহার করবে না, আমাকে খাঁটি মানুষ হিসেবে দেখতে শিখো।” এই মানবিকতার দাবিটা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত, ধর্ষণ বিরোধী মিছিল থামবে না, থামা উচিতও না।