নারীদের জন্য ফুটবল কেন হারাম?

জানুয়ারির শীতের দুপুরে জয়পুরহাটের এক গ্রামীণ মাঠে কয়েক ডজন মেয়ে জার্সি গায়ে বল পায়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, হঠাৎই মাইক থেকে ভেসে এল হুমকির সুর। স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও কিছু ইসলামপন্থী সংগঠনের নেতা ঘোষণা করলেন, “মেয়েদের ফুটবল ইসলামসম্মত নয়, মাঠে নামলে পাপ হবে, আল্লাহর গজব নামবে”, আর সেই কথার জোরে তারা মাঠে ঢুকে খেলা বন্ধ করে দিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আশ্রয় সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন জানায়, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে গ্রামীণ অঞ্চলে নারীদের খেলাধুলা, বিশেষ করে ফুটবল ও ক্রিকেটের টুর্নামেন্ট একের পর এক থামিয়ে দেওয়া হয়েছে, জয়পুরহাট, নাটোর, নওগাঁ, সুনামগঞ্জসহ অন্তত ছয়টি জেলায় মেয়েদের ম্যাচে হামলা, হুমকি বা প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। কোথাও মাঠে ঢুকে পোস্টার টানানো হয়েছে যে নারীর খেলাধুলা নাকি “বেহায়াপনা ও ফিতনা”, কোথাও বাবাদের ডেকে বলা হয়েছে “মেয়েকে যদি নামাও, তাহলে সমাজ তাকে আর ভালো চোখে দেখবে না।”
 
মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যম বিশ্লেষণে বলছে, ছাত্র আন্দোলন, সরকার পতন আর রাজনৈতিক টালমাটালের সুযোগে ইসলামী দলের প্রভাব গ্রামাঞ্চলে দ্রুত বেড়েছে, তারা নিজেদের “নৈতিক পাহারাদার” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। একদিকে পুরোনো সরকার নারীর ক্ষমতায়নের গল্প শুনিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাহবা কুড়িয়েছে, অন্যদিকে জমি, মাঠ, মসজিদ, মাদরাসার অন্দরমহলে গড়ে তোলা হয়েছে এমন এক পরিবেশ, যেখানে কিশোরী মেয়ের জার্সি পরে মাঠে নামা মানেই “ইজ্জতের ঝুঁকি” এখন অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিধা আর ভোটের রাজনীতির হিসাব মিলে অনেক জেলায় প্রশাসন সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নারী ফুটবল টুর্নামেন্ট স্থগিত করছে, বা আনুষ্ঠানিক অনুমতি না দিয়ে কার্যত থামিয়ে দিচ্ছে।
 
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে এই দৃশ্যগুলোকে দেখি কেবল এক আধটা ম্যাচ বাতিল হওয়ার খবর হিসেবে নয়, বরং নারীর শরীর, আনন্দ, ক্রীড়া ও স্বাধীন চলাফেরার ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ হিসেবে। যে রাষ্ট্র নিজেকে উন্নয়নের মডেল বলে প্রচার করে, সেখানেই গ্রামের মাঠে ছেলেরা দিব্যি শর্টস পরে খেলতে পারে, কিন্তু মেয়েরা একই কাজ করতে চাইলে তাকে “হারাম”, “অশালীন”, “ফিতনা” বলে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, আর প্রশাসন অনেক সময় নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঠ থেকে বিতাড়িত এই মেয়েগুলোর গায়ে ভবিষ্যতে হয়তো কোনো পদক ঝুলবে না, কিন্তু তাদের হাসি, তাদের দৌড়, তাদের ঘামের মধ্যে যে স্বাধীনতার সম্ভাবনা ছিল, সেটাকেই আজ আমাদের সমাজ ভয় পায়, আর সেই ভয়কে “ধর্ম” আর “সংস্কৃতি”র নামে পবিত্রতা দিয়ে গলাটিপে ধরে।