এপ্রিলের শেষ দিকে ঢাকার কাকরাইলে এক বৈঠক শেষে হেফাজতে ইসলাম যে পাঁচ দফা দাবি ঘোষণা করল তার কেন্দ্রে ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা নারী অধিকার বাড়ানোর যে কোনো প্রচেষ্টা তারা বরদাস্ত করবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত উইমেন্স অ্যাফেয়ার্স রিফর্ম কমিশন প্রস্তাব দিয়েছিল সব ধর্মের নারীর জন্য একীভূত পারিবারিক আইন প্রণয়ন করতে যাতে বিয়ে তালাক উত্তরাধিকার ভরণপোষণ সবক্ষেত্রেই নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হয় আর সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারী সাংসদের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বাড়ানো যায়। কমিশনের সুপারিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল বর্তমানে ইসলামী উত্তরাধিকার ও পারিবারিক আইনের নানা বিধান নারীর প্রতি বৈষম্য তৈরি করে যা সংবিধানের সমতা নীতির পরিপন্থী। হেফাজত নেতারা এই রিপোর্টকে “আলেম সমাজ ও ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা” আখ্যা দিয়ে কমিশন পুরোপুরি বাতিল করা এবং এর প্রতিবেদন ছিঁড়ে ফেলার আহ্বান জানায় একই সাথে দাবি তোলে সংবিধানে বহুত্ববাদ বা pluralism শব্দ বাদ দিয়ে আগের মত “আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা” ফিরিয়ে আনতে হবে।
সম্প্রতি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হেফাজতের গ্র্যান্ড র্যালিতে প্রায় বিশ হাজার মানুষ অংশ নেয় যেখানে বারবার শোনা যায় “পুরুষ ও নারী কখনো সমান হতে পারে না” “সমান উত্তরাধিকার পশ্চিমা কুফরি ধারণা” “নারী উন্নয়নের নামে বেহায়াপনা চলবে না” ধরনের স্লোগান। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উল্লেখ করেছে এই সমাবেশে হেফাজত শুধু কমিশন বাতিল আর সমান উত্তরাধিকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানই করেনি বরং স্পষ্ট ভাষায় লিঙ্গ সমতাকে ইসলামবিরোধী ঘোষণা করে সব “অ্যান্টি ইসলামিক” কার্যক্রম বন্ধ করার দাবি তুলেছে যার মধ্যে তারা নারী ও পুরুষের সমান আইনি মর্যাদা ব্লাসফেমি সংশোধনী বাতিল সেক্স ওয়ার্কারদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি ইত্যাদিকে একসাথে গুঁজে দিয়েছে। সমাবেশের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের ৬৭টি নারী ও মানবাধিকার সংস্থা যৌথ বিবৃতিতে বলেছে হেফাজত যে বক্তব্য ব্যবহার করেছে তা শুধু নারী অধিকারবিরোধীই নয় বরং ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধোত্তর সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমতা নীতির সাথেও সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং অন্তর্বর্তী সরকার যদি এই চাপে নতি স্বীকার করে তবে বিগত কয়েক দশকের লিঙ্গ অগ্রযাত্রা এক ধাক্কায় পেছনে চলে যাবে।
একজন উভকামী নাস্তিক নারীবাদী নারী হিসেবে এই দাবিগুলোকে দেখি আমাদের শরীর জীবন সিদ্ধান্ত আর উত্তরাধিকারকে আবারও পুরুষ ধর্মগুরুদের টেবিলে তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে। নারী উন্নয়ন নীতি বা নতুন কমিশনের মতো কাঠামো নিখুঁত না হলেও সেগুলো অন্তত এক ধরনের স্বীকৃতি দিচ্ছিল যে নারী কেবল মা বোন স্ত্রী না সে পূর্ণ নাগরিক আর তার সম্পদ কর্মক্ষেত্র সংসদীয় আসন উত্তরাধিকার যৌনতা সব ক্ষেত্রেই দেহের উপর নিজের অধিকার থাকা উচিত। হেফাজতের এই প্রত্যাঘাত দেখায় নতুন বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু বদলালেও পুরোনো পিতৃতন্ত্র আর ধর্মীয় পুরুষ আধিপত্য কতটা অটুট আছে আর কত সহজে “ধর্মের অনুভূতি”র নামে তারা নারীর অগ্রযাত্রাকে আবারও মধ্যযুগের অন্ধকারে ঠেলে দিতে প্রস্তুত।