আমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করি, শুধু নারী হওয়া মানেই সে নারীর পক্ষের মানুষ? পিতৃতন্ত্রের এই দেশটাতে কতদিন ধরে শুনে আসছি, “নারী নেতৃত্ব এসেছে, এখন নারীরা আরও নিরাপদ”, “মেয়ে প্রধানমন্ত্রী, মহিলা এমপি, নারী সংগঠনের সভাপতি, এখন তো নারীর উপর অত্যাচার কমার কথা।” অথচ বাস্তবতা বারবার উল্টো উদাহরণ ছুড়ে আমাদের মুখে মারে। শামীমা নূর পাপিয়া, শাসকদলের অঙ্গসংগঠনের এক সময়ের ক্ষমতাধর নেত্রী, নানা অপরাধ আর কেলেঙ্কারিতে জেলে, আর সেখানেই গিয়ে আবার আরেক নারীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগে খবরের শিরোনামে। ক্ষমতার গন্ধ যে কারও মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারে, নারী, পুরুষ, অন্য লিঙ্গ, কারও ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম নেই।
কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে যখন আইনজীবী প্রশিক্ষণার্থী রুনা লাইলাকে মারধর, শারীরিক নির্যাতন, লাঞ্ছনার অভিযোগ উঠল, তখন বেরিয়ে এল পাপিয়ার জেলের ভেতরের সাম্রাজ্যের গল্প। রিপোর্টগুলোতে লেখা ছিল, জেলে থেকেও সে নাকি “ভিআইপি বন্দি” জেলকর্মীদের একাংশ, কিছু বন্দি, সবাই মিলে একটা চক্র তৈরি করেছে, যার শিকার হয়েছে নতুন আসা নারীরা। কারাগারের নিয়ম ভেঙে খাবার, মোবাইল, সুবিধা নিয়ে নিজের একটা ক্ষমতার বলয় গড়ে তুলেছে পাপিয়া আর কেউ সেই বলয়ের কথা না শুনলে, তার গায়ে হাত পড়েছে, তাকে অন্ধকার সেলে পাঠানো হয়েছে, মানসিক শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। অভিযোগের পর তাকে কুমিল্লা জেলে বদলি করা হলেও, ওই কয়েক দিনের ভেতরে যে ক্ষতটা তৈরি হয়েছে, সেটা শুধু একজন নারীর শরীরে না, আমাদের তথাকথিত নারীবাদের মুখেও।
আমরা যারা সমতলে বসে নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন, কোটা, নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলি, তাদের অনেকেই সহজ একটা স্লোগান তুলে নিই, “আরও নারী নেতৃত্ব চাই।” কথাটা ভুল না সংসদে, প্রশাসনে, দলে, সংগঠনে নারী কম, প্রতিনিধিত্ব আরও হওয়া দরকার। কিন্তু নারী নেতৃত্ব মানেই কি নারীবাদী নেতৃত্ব? ক্ষমতার কাঠামো যদি একই থাকে, দুর্নীতি, দমন, দলীয় চাটুকারিতা, গরিবের ওপর অত্যাচার, বিরোধী কণ্ঠের ওপর হামলা, তাহলে সেখানে নারী গিয়ে বসলে কি জাদুমন্ত্রে সব বদলে যাবে? পাপিয়ার মতো এক নারী যখন একই পুরুষতান্ত্রিক দমনমূলক রাজনীতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন সে নিপীড়ক হিসেবেই কাজ করে, আর সেই নিপীড়নের শিকারও হয় মূলত অন্য নারী, গরিব নারী, প্রান্তিক নারী।
কারাগারগুলো নিয়ে যে চিত্র বেরিয়ে এসেছে, তাতে নারী বন্দিদের অবস্থাও পুরুষ বন্দিদের মতোই নির্যাতন, ভীতি আর অমানবিকতার মধ্যে ডুবে আছে। কাশিমপুর মহিলা কারাগারে এক নারী বন্দিকে নির্যাতনের ঘটনায় ছয়জন নারী কারারক্ষীর বদলি হওয়ার খবরও এসেছে, মানে, শুধু একজন পাপিয়া না, একটা পুরো সিস্টেম আছে যা ক্ষমতাশালী বন্দির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুর্বলদের কণ্ঠ চেপে ধরে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রিপোর্টেও বারবার উঠে এসেছে, বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে অতিরিক্ত ভিড়, আইনি সহায়তার অভাব, নির্যাতন, “ভিআইপি বন্দি” আর গরিব বন্দির মধ্যে বৈষম্য, এসবই নিত্যদিনের বাস্তবতা। সেখানে নারী বন্দিরা দ্বিগুণ প্রান্তিক, বাইরের সমাজ তাদের “অপরাধী নারী” বলে ঘৃণা করে, ভেতরের সিস্টেম তাদের দেখে “কম ক্ষমতাসীন মানুষের শরীর” হিসেবে, যে শরীরে হাত রাখা যায়, গালি দেওয়া যায়, লাঞ্ছনা করা যায়।
আমাদের নারীবাদের এক বড় সমস্যা হল, আমরা প্রায়ই “সিস্টারহুড” এর একটা রোমান্টিক ছবি আঁকি, যেখানে ধরে নেওয়া হয় সব নারী একে অন্যের বন্ধু, একে অন্যের পাশে দাঁড়াবে। বাস্তবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে অনেক নারীই পুরুষতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে কাজ করে, শাশুড়ি, জা, বস, নেত্রী, শিক্ষক, নানা ভূমিকা নিয়ে। তারা পিতৃতন্ত্রের পুরস্কার পায়, কিছু সুবিধা, কিছু ক্ষমতা, কিছু সম্মান, এর বিনিময়ে তারা একই ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখে। পাপিয়া তার দলের, তার পরিচয়ের, তার আগের ক্ষমতার জোরে জেলে গিয়েও অন্য নারীর শরীরে অত্যাচার চালাতে পারছে, এটাই তার প্রমাণ। এই জায়গা থেকে আমাদের বুঝতে হবে, নারীবাদ মানে শুধু “নারী নারীকে সাপোর্ট করবে” না নারীবাদ মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, যে ই সেই অন্যায় করুক, সে নারী পুরুষ তৃতীয় লিঙ্গ কেউ হতে পারে।
নিজে একজন উভকামী নারী, নাস্তিক, বহুবার সামাজিক রাজনৈতিক সহিংসতার লক্ষ্য হওয়া মানুষ হিসেবে জানি, কাগজে কলমে নারী হওয়া আর বাস্তবে নারীর নিরাপত্তার পক্ষ নেওয়া এক জিনিস না। অনেক নারী রাজনীতিবিদকে দেখেছি, প্রকাশ্যে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলে কিন্তু গোপনে তারা এমন আইন, নীতি আর কাঠামো সমর্থন করেন, যেগুলো নারী, কুইয়ার, সংখ্যালঘু সব প্রান্তিক মানুষকে আরও বিপন্ন করে। কেউ ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনকে সমর্থন করেন, কেউ জোর করে পর্দা, শালীনতা, “পারিবারিক মূল্যবোধ” এর নামে নারীর শরীর নিয়ন্ত্রণকে জায়েজ করেন, কেউ আবার ধর্ষণের মামলায় আপোষের কথা বলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে ব্যর্থ হন। পাপিয়ার জেলে নির্যাতনের কেস তাই আলাদা না এটা সেই একই গল্পের এক দৃশ্য, যেখানে নারী শরীর নিয়ে রাজনীতি করতে করতে আমরা ভুলে যাই, নারীর হাতে ক্ষমতা মানেই নারীবাদ না, মানেই নিরাপত্তা না।
আসল নারীবাদকে তাই আমাদের বারবার ফিরে যেতে হচ্ছে মূল প্রশ্নের দিকে, ক্ষমতা কার হাতে, কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোন কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে? যদি কারাগারের ভেতরে গরিব নারী বন্দিদের ওপর অত্যাচার চালানো হয়, যদি তাদের অভিযোগ নিতে কর্তৃপক্ষ গড়িমসি করে, যদি মিডিয়া সামান্য চাপ তৈরি করলে শুধু একজনকে বদলি করে বাকি কাঠামো অক্ষত রাখা হয়, তাহলে সেখানে নারী নেত্রী, নারী কারারক্ষী, নারী মন্ত্রী থেকে কেউই “আমাদের পক্ষের মানুষ” না। আমাদের পক্ষের মানুষ সে ই, যে এই কাঠামোর বিরুদ্ধে কথা বলবে, যে বলবে কারাগারও একটা মানবাধিকার ক্ষেত্র, যেখানেও প্রতিটি মানুষের মর্যাদা আছে, অপরাধী হোক বা না হোক।
ক্ষমতার অন্ধকূপে পাপিয়ার মতো নারীর উত্থান তাই আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার সুযোগ। এটা বুঝিয়ে দেয়, শুধু নারী কোটা বাড়িয়ে, নারী নেত্রী সাজিয়ে, নারীর নামে সংগঠন বানিয়ে নারীবাদ তৈরি হয় না। আমাদের দরকার পিতৃতন্ত্র বিরোধী, ক্ষমতার অপব্যবহার বিরোধী, নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া রাজনীতি, যেখানে নারীর শরীরকে আর ক্ষমতার মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। যে দিন আমরা বুঝতে পারব, “নারী” হওয়া একটা জেন্ডার, কিন্তু “নারীবাদী” হওয়া একটা নৈতিক পজিশন, সেদিন থেকে হয়তো ক্ষমতার এই অন্ধকূপগুলো একটু একটু করে আলোর মুখ দেখবে।
ততদিন পর্যন্ত পাপিয়ার মতো নারীরাই আমাদের শিখিয়ে যাবে, নারীবাদ যদি শুধু “মেয়েদের ক্ষমতা” নিয়ে ব্যস্ত থাকে, আর সেই ক্ষমতার ভেতরকার সহিংসতা দেখতে না পায়, তবে সেটা আসলে পিতৃতন্ত্রেরই নতুন পোশাক, অন্য কিছু না।